Type to search

Uncategorized

উন্নয়ণের ফসল খেয়ে ফেলছে চেলাপেলারা!

Share

গ্রাম পর্যায়ে বিদ্যুৎ পেতে গ্রাহককে কি পরিমান ভোগান্তির শিকার হতে হয় তা জানতে চলুন বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা থানার হরিদেবপুর গ্রাম থেকে ঘুরে আসি।
১৯৯৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় গলাচিপা আসনের এক প্রার্থী বলেছিলেন নির্বাচনে জয় পেলে তিনি ৬ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ এনে দিবেন। তিনি পাশ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ ফেল করেছিল। এভাবে ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিবারই নির্বাচনের আগে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বিদ্যুতের দেখা পেতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাও ভাল! কিন্তু মন্দটা যে না জানলেই নয়।
২০১৬ সালে বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমোদন পেয়ে কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষ অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলো এবং ভেবেছিলো এবার তাদের ঘর আলোকিত হবে এবং তাদের কৃষিকাজও সহজ হবে। তাদের ছেলেমেয়েরা আরও ভালভাবে পড়াশুনা করতে পারবে। কিন্তু ‘বিদ্যুৎ’ এখন তাদের কাছে বিষফোঁড়ার মতন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ নামক স্বস্তি এখন ওই এলাকার মানুষের অস্বস্তিতে পরিনত হয়েছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ লাইনের কাজ শুরু হলেও পদে পদে পয়সা খরচা করেও সাধারণ গ্রামবাসী বিদ্যুৎ মহাশয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এক এক করে দেখে নেই কত উছিলায় মানুষের কাছ থেকে অর্থ বাগিয়ে নিচ্ছে সুবিধাভোগীরা।
১। বিদ্যুৎ লাইন নিতে প্রথমে সদস্য হওয়ার জন্য ২০ টাকা করে নেওয়া হয় প্রতিটি ঘর থেকে। একই নাম করে পরবর্তীতে আবার ৫০ টাকা এবং আরেকবার ১০০ টাকা আদায় করা হয়।
২। বৈদ্যুতিক খাম্বা পরিবহন খরচবাবদ প্রতি ঘর ও দোকান থেকে প্রতিটি খাম্বা বাবদ ৫০০ টাকা করে নেয়া হয়েছে। কারো কাছ থেকে ১০০০ টাকাও আদায় করা হয়েছে।
৩। প্রতিটি খাম্বা বসানোর জন্য ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
৪। যারা এই বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ করছেন তারা নির্দিষ্ট করে দিচ্ছেন ঘরে বা দোকানে কি কি জিনিস লাগাতে হবে আর তা তাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া দোকান থেকেই কিনতে হবে। এই লিস্ট নিতেও ৫০টাকা বাধ্যতামূলক দিতে হচ্ছে। কিন্তু যেখান থেকে যে পণ্য কিনতে বাধ্য করা হয়েছে তা মানসম্মত নয় বলে অনেকের অভিযোগ রয়েছে।
৫। ওয়ারিং করাতে হয় প্রকল্পের পছন্দের লোক দিয়ে। অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করলে মিটার দেওয়া হয় না। তাদের লোকেরা শুধুমাত্র তিনটি লাইটের পয়েন্ট করে দিয়েছে ৭০০ টাকার বিনিময়ে।
এরপর যদি কেহ আরও কোন পয়েন্ট করতে চায় তাহলে প্রত্যেকটির জন্য ২৫০টাকা করে অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে।
৬। খাম্বায় খাম্বায় যে তার টানা হয়েছে তার জন্য নেওয়া হয়েছে ১০০ টাকা করে।
৭। বৈদ্যুতিক খাম্বা থেকে মিটার পর্যন্ত যেই সার্ভিস তার টানা হয়েছে তার জন্য নেয়া হয়েছে ১০০ টাকা।
৮। মিটার এর জন্য নেওয়া হয়েছে ৮৫০ টাকা।
৯। মিটার লাগানোর জন্য ১০০টাকা ।
গ্রামবাসীর প্রশ্ন; সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাশ হওয়া বিদ্যুৎ লাইনে এত টাকা গ্রাহককে কেন দিতে হবে?
কেনই বা তাদের পছন্দের লোক দিয়েই ঘরের ওয়ারিং করাতে হবে? কেনই বা তাদের পছন্দের দোকান থেকেই উচ্চ মূল্যে জিনিসপত্র কিনতে হবে?
বিদ্যুৎ লাইনের কাজ সম্পূর্ন না হওয়ার আগেই গলাচিপা আসনের সংসদ সদস্য ১৯জানুয়ারী ২০১৬ তারিখে বিদ্যুৎ লাইনের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের মাসখানেক পর বিদ্যুৎ লাইনের কাজ শেষ হয়।
বর্তমানে আশপাশের এলাকাগুলোতে লাইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। প্রতিটি ট্রান্সমিটারের আওতায় ১৫/২০ টি ঘর রয়েছে। সবকিছুই সম্পূর্ণ হয়েছে। শুধু ফিউজ দিলেই গ্রাহক বিদ্যুত ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু প্রতিটি ঘর থেকে ৫০টাকা করে না দিলে তারা ফিউজ দেয় না।
এখানেই শেষ নয়।
এই লাইনে যে ট্রান্সমিটারগুলো দেওয়া হয়েছে তা অনেক পুরাতন ট্রান্সমিটার। যার অনেকগুলোতে ফিউজ দেওয়ার সময়ই নষ্ট হয়ে গেছে। এরপর বলা হয়েছে নতুন ট্রান্সমিটার আনতে হবে। সবাইকে আবার টাকা দিতে হবে।
টাকাও দেওয়া হয়েছে তবে ট্রান্সমিটার এখনো পৌছায়নি। অথচ মাস শেষ। অন্তত পক্ষে সর্বনিম্ন বিদ্যুৎ বিল গ্রাহককে ঠিকই দিতে হবে।
এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা করে কোন রকম পেটে চালায়। তাদের পক্ষে কিছুদিন পরপর কারণে অকারণে অন্যায় অযৌক্তিক টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত প্রতিটি ঘর থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০০ টাকা করে খরচা করে ফেলেছে সাধারণ গ্রাহক। যার একটি টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। একজন সাধারণ পান বিক্রেতা আফসোস করে বলেন, “ঘরে বিদ্যুৎ নিতে তাঁর ব্যবসার পুঁজিই শেষ হয়ে গেছে”।
স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে গ্রামবাসীরা গিয়েছেন বিষয়টি গণ্যমাধ্যমে তুলে ধরে যথাযথ কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার জন্য। কিন্তু সংবাদ লিখতে, পাঁঠাতে আর ছাপাতে নাকি অনেক খরচ। তাই সাংবাদিকরাও টাকা দাবী করেছিলেন। টাকা ছাড়া নাকি পত্রিকার পাতায় সংবাদও ছাপানো যায় না। তবে কারিনা নাকি রুটিও বানাতে জানেন সেই কথা আমরা পত্রিকার পাতাতেই পাই।
যাইহোক, এই চিত্র শুধুমাত্র একটি গ্রামের। প্রতিটি এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে একই রকম চিত্র বিদ্যমান। সরকার সংশ্লিষ্টরা কি দয়াকরে এই বিষয়গুলোর দিকে কি একটু খেয়াল রাখবেন?
হাজার হাজার মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যেই সাফল্য সরকার দেখিয়েছে তা যদি সঠিকভাবে সাধারণ মানুষ দুয়ারে না পৌছায় তাহলে বাহাবা দেওয়ার বদলে মানুষ অভিশাপ দিলে কিছুই করার থাকবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *